আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্যই রসুন। তবে তা রসুনের উৎপাদন বা চাষ নিয়ে। এই অতি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়টি সব সময় ই চাপা পড়ে যায় রসুনের উপকারিতা আর অপকারিতার আড়ালে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে রসুন আমরা নিজেরাই উৎপাদন করতে পারি।
আমরা মূলত দুটা বিষয় ক মূল ধরে অগ্রসর হব।
১. গতানুগতিক চাষাবাদ
২. ঘরোয়া পদ্ধতি
১. প্রথমে আমরা গতানুগতিক চাষবাদ পদ্ধতি টি আলোচনা করবো।
প্রাচীন পদ্ধতি অনুযায়ী রসুন চাষ করা হয় বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠে। যেখানে সেচ ও সারের ব্যবহার সহজ হয়। আমাদের নিত্য রসনার উপকরণটির সিংহ ভাগই এ পদ্ধতি মেনে চাষাবাদ করা হয়।
এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন,
(ক) মাটি
(খ ) তাপমাত্রা
(গ ) সেচ
(ঘ )সার
(ঙ) রসুন উত্তোলন
(ক) মাটি : রসুন চাষে মাটি উপযুক্ত করে তৈরি করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাটিক আমিতোতো দুই বার চাষ দিয়ে মই দিয়া নিতে হবে। মাটি নির্বাচনে অবশ্যই শক্ত মাটি পরিহার করতে হবে। রসুন নরম প্রকৃতির ফসল বিধায় শক্ত মাটিতে রসুনের করে ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নিকাশীব্যবস্থা যুক্ত উর্বর পলি ও দোঁ-আঁশমাটি যুক্ত জমি রসুন চাষের জন্য আদর্শ।
(খ ) তাপমাত্রা: রসুন চাষের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার দিকে নজর দেওয়াটা জরুরী। এ ক্ষেত্রে আদর্শ তাপমাত্রা হলো ১৫-২০ ডিগ্রী সে.। একটা বিষয় খেয়াল রাখা
জরুরি তা হলো তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রী সে. এর বেশি হলে গাছগুলি ব্যবহারিকভাবে বাল্বগুলি বিকাশ করে না।
(গ ) সেচ: রসুন লাগানোর পর জমির রস বুঝে সেচ দিতে হয়। রসুনের কোয়া লাগিয়েই একবার সেচ দেওয়া হয়। এর পর চারা বের না হওয়া পর্যন্ত জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে। চারা একবার হয়ে গেলে ১০-১৫ দিন অন্তর সেচ দিলেও চলে। রসুনের জমিতে বিশেষ করে, কন্দ গঠনের সময় উপযুক্ত পরিমাণে রস থাকা দরকার। সে জন্য এ সময় অবশ্যই সেচ দিতে হবে। কন্দ যখন পরিপক্ক হতে থাকে তখন সেচ কম দিতে হয়। এই ফসলে মোটামুটি ৪-৫ টি সেচের দরকার হয়। ড্রেনের দু পাশের নালা দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সুবিধাজনক। নালা দিয়ে জমিতে সমভাবে ও সহজেই পানি সেচ দেয়া এবং জমিতে বেশি পানি থাকলে তা বের করে দেওয়া যায়। তবে ফসল কাটার ১০-১৫ দিন আগে থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হয়।
(ঘ )সার : অন্যান্য ফসলের ন্যায় রসুন এর ক্ষত্রে ও ছত্রাক এর আক্রমণ লক্ষ করা যায়। তাই নিয়মানুযায়ী ছত্রাক নাশক ব্যবহার করা হয়।
(ঙ) রসুন উত্তোলন : রসুন জমিতে লাগানো থেকে উত্তোলন অব্দি ১৬-৩৬ সপ্তাহ সময় নেয়। উত্তোলনের সময় রসুনের নুতন গ্যাস টি বাদামি হয়ে নুয়ে পড়ে। গাছসহ রসুন তোলা হয় এবং ঐ ভাবে ছায়াতে ভালভাবে শুকিয়ে মরা পাতা কেটে সংরক্ষণ করা হয়।রসুন খুব ভালোভাবে পরিপক্ক করে নিয়ে ক্ষেত থেকে তুলতে হবে। অপরিপক্ক রসুন তুললে সেটা থেকে বীজ করা যাবে না। জমিতে ফুলকা হলে বুঝতে হবে রসুন পরিপক্ক হয়েছে।
২. ঘরোয়া পদ্ধতি : বর্তমান সময়ে ঘন বসতি পূর্ণ শহরাঞ্চলে বেলকনি আর ছাদে স্বল্প পরিসরে চাষাবাদ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এভাবে উৎপাদন করা যায় এমন সব ফসলের মধ্যে রসুনও একটি ফসল। চলুন জেনে নেওয়া যাক ঘরোয়া এ পদ্ধতি ব্যবহার করে রসুন চাষ আর পর্যিক্রমিক ধাপ গুলো।
(১) মাটি তৈরী: বাড়িতে থাকা পরিত্যাক্ত অথবা নুতন যা কোনো প্লাস্টিক এর গামলা অথবা কাঠের পাত্র বা সাবেক মাটির টব হলেই চলবে। তবে মাথায় রাখতে হবে বেশি বড় আকারের কন্টেনার যেন না হয়। মাঝারি সাইজ হলেই ভালো হয়। পাত্রের তলায় ড্রিলিং করে ২-৪টা ফুটো করে সেগুলো মার্বেলের নুড়ি দিয়ে কভারনিতে হবে। কারণ এটি একদিকে যেমন টবে জল জমতে দেবে না অপরদিকে মাটি ধোয়া আটকাবে। মনে রাখতে হবে, একেকটি টবে ১০-১৫টি রসুন গাছ চাষ করা সম্ভব।
মাটি তৈরির জন্য নার্সারি থেকে ভার্মিকম্পোস্ট ও অর্গানিক সয়েল সংগ্রহ করে নেওয়া যায়। এর অনুপাত হবে ৬০% ভার্মিকম্পোস্ট ও ৪০% অর্গানিক সয়েল। দুটোকে ভালো করে মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নেবেন। জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ মাটি রসুন চাষে সর্বোত্তম। টবে মাটি ৩-৪” পরিমাণ জায়গা ছেড়ে ভর্তি করে দিতে হবে।
(২)বীজ বপন কৌশলঃ
রসুন এর কোয়া থেকে রসুন গাছ জন্ম নেয়। যেহেতু এটি মাটির ভেতরে বাড়ে তাই এটির জন্য উপযুক্ত হবে যদি বড়ো শল্কযুক্ত কন্দের রসুন বাজার থেকে নির্বাচন করে কেনেন। রসুন নিয়ে এরপর কোয়া গুলো আলাদা করে নিন। আঙ্গুল দিয়ে মাটির উপর চাপ দিয়ে গর্ত করে রসুনের ভোঁতা বা ফ্ল্যাট দিকটি প্রবেশ করান। ৩-৪” গ্যাপ দিয়ে একেকটি কোয়া বপন করুন কারণ প্রত্যেক কোয়া থেকে একটি গোটা রসুন বেরোবে।
সবগুলো পোঁতা হয়ে গেলে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে বেশ কয়েকবার। সারফেস ভিজে রাখলেই যথেষ্ট। অতিরিক্ত পানি দিলে রসুন পচে যাবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
চাষের সময়ঃ
সাধারণত অক্টোবর এর মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বর অব্দি ঘরোয়া চাষের পক্ষে এটি যথোপযুক্ত।
সারঃ
ইউরিয়া, টিএসপি ইত্যাদি সার এই চাষে খুব কাজ দেয়। অধিক ফলনের জন্য ব্যবহার করতেই পারেন। রসুনে ছত্রাক আক্রম থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ছত্রাক নাশক ব্যবহার করতে হবে।
পরিচর্যাঃ
লক্ষ্য রাখতে হবে গাছের গোড়ায় মাটির উপর যেন পানি না জমে সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে পার্পল ব্লচ, স্মাট রোগ রসুন গাছের কমন রোগের মধ্যে পড়ে। এগুলোর মোকাবিলার জন্য রোভিরাল ও রিডোমিন স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। চেষ্টা করুন সর্বদা আলো বাতাসপূর্ণ জায়গায় গাছ রাখার।
ফসল সংগ্রহঃ
চারা বাদামি বর্ণ ধারণ করলে ফসল তুলে ব্যবহার করতে পারেন।


